হোম ইকোনমিকস কলেজের অধ্যক্ষ অবরুদ্ধ, শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ
যমুনা নিউজ বিডি: রাজধানীর গভর্নমেন্ট কলেজ অব অ্যাপ্লাইড হিউম্যান সায়েন্সের (হোম ইকোনমিকস কলেজ) অধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. মেহেরুন্নেছার পদত্যাগের দাবিতে শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ করেছেন। অনিয়ম, স্বেচ্ছাচারিতা, আবাসিক হলের আসন বাতিলের হুমকি এবং অডিটোরিয়ামের বিদ্যুৎ বিল বাবদ ১২ হাজার ৬০০ টাকা জরিমানা দাবির প্রতিবাদে বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) সকাল সাড়ে ১০টা থেকে অধ্যক্ষকে তার নিজ কার্যালয়ে অবরুদ্ধ করে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন তারা। এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত (সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা) অধ্যক্ষ আট ঘণ্টার বেশি সময় ধরে তার কক্ষে অবরুদ্ধ ছিলেন।
বৃহস্পতিবার সকালে কলেজের প্রশাসনিক ভবনের সামনে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন ছাত্রীরা। এ সময় তারা ‘দফা এক দাবি এক, প্রিন্সিপালের পদত্যাগ’ এবং ‘প্রিন্সিপালের কালো হাত, ভেঙে দাও গুঁড়িয়ে দাও’ স্লোগান দেন। শিক্ষার্থীরা জানান, অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের বিভিন্ন অনিয়ম ও স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগের পাশাপাশি সম্প্রতি দুই আবাসিক শিক্ষার্থীর হলের আসন বাতিলের সিদ্ধান্ত এবং বিদ্যুৎ বিলের নামে জরিমানা দাবির ঘটনায় তারা ক্ষুব্ধ হয়েছেন।
আন্দোলনরত শিক্ষার্থী ও কলেজ প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, পূজার ছুটির আগে কলেজ অডিটোরিয়ামে তিনটি আবাসিক হলের পাঁচ বিভাগের মাস্টার্স শেষ বর্ষের শিক্ষার্থীদের বিদায় অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানটি প্রথমে রাত ১০টার মধ্যে শেষ করার নির্দেশনা দেওয়া হয়, পরে শিক্ষার্থীদের অনুরোধে সময় বাড়িয়ে রাত ১২টা পর্যন্ত করা হয়। তবে অনুষ্ঠান শেষ হতে ভোর ৪টা থেকে ৫টা বেজে যায়।
নির্ধারিত সময়ের পরও অডিটোরিয়াম ব্যবহার করায় অধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. মেহেরুন্নেছা দুই শিক্ষার্থীর আবাসিক হলের আসন বাতিলের সিদ্ধান্ত নেন। পরে ওই শিক্ষার্থীরা ক্ষমা চাইতে গেলে আসন ফিরিয়ে দেওয়ার শর্ত হিসেবে এক রাতের অডিটোরিয়ামের এসি ও বিদ্যুৎ বিল বাবদ ১২ হাজার ৬০০ টাকা জরিমানা দাবি করা হয় বলে অভিযোগ করেন শিক্ষার্থীরা।
কলেজের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের মাস্টার্স প্রথম পর্বের শিক্ষার্থী তাবাসসুম বলেন, ‘দুইটা স্টুডেন্টের সিট অযৌক্তিকভাবে বাতিল করার কারণেই এই আন্দোলনটা। আমরা ম্যাডামের কাছে হাত-পা জোড় করে ক্ষমা চাইলে ম্যাডাম বলেন, আমাদের স্যরি অ্যাকসেপ্ট করেছেন এবং শাস্তিস্বরূপ এক রাতের অডিটোরিয়ামের বিল বাবদ ১২ হাজার ৬০০ টাকা চাঁদা দিতে হবে। আমাদের স্টুডেন্টদের পক্ষে এই টাকা দেওয়া সম্ভব না।’
তিনি আরও বলেন, ‘এটা মওকুফ করা যায় কি না বলতে গেলে আমাদের একজন স্টুডেন্ট ম্যাডামের পা ধরেছে। কিন্তু ম্যাডাম ওই স্টুডেন্টকে পা দিয়ে ধাক্কা দিয়ে চলে গিয়েছেন। বলতে গেলে একেবারে লাথি মারা ও ধাক্কা পর্যন্ত দেওয়া হয়েছে।’
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, বৃহস্পতিবার সকালে এসব বিষয় নিয়ে অধ্যক্ষের সঙ্গে কথা বলতে গেলে তিনি তাদের বক্তব্য না শুনে ধমক দেন। এরপর সকাল সাড়ে ১০টার দিকে অধ্যক্ষের কার্যালয়ে তালা দিয়ে অবস্থান নেন ছাত্রীরা।
আন্দোলনকারীরা জানান, প্রায় এক বছর আগে বেগম বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজ থেকে এ কলেজে যোগ দেওয়ার পর থেকেই অধ্যক্ষ একের পর এক অযৌক্তিক নিয়ম চাপিয়ে দিচ্ছেন। এর আগে বদরুন্নেসা কলেজে দায়িত্ব পালনকালে তিনি দুই হলের ফ্রিজ ও বিদ্যুতের সুইচ বন্ধ করে দিয়েছিলেন বলেও অভিযোগ তাদের।
শিক্ষার্থীদের দাবি, বর্তমান কলেজের আবাসিক হলগুলোতে পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা না থাকলেও মাসিক ফি ৬০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৭০০ টাকা করা হয়েছে। আগামী বছর আরও ১০০ টাকা বাড়ানোর ঘোষণাও দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া অধ্যক্ষ তার সরকারি বাংলোতে নিয়মবহির্ভূতভাবে বহিরাগতদের সাবলেট দিয়েছেন বলেও অভিযোগ করেন তারা।
অধ্যক্ষকে কার্যালয়ে অবরুদ্ধ করার বিষয়ে কলেজের উপাধ্যক্ষ অধ্যাপক হাবিবা ইয়াছমিন বলেন, ‘আজ সকালে আমি ও আমাদের শিক্ষক পরিষদের সম্পাদক আপার (অধ্যক্ষের) রুমে বসে ছিলাম। হঠাৎ অনেকগুলো মেয়ে কথা বলার নাম করে ভেতরে ঢুকে আমাকে ও সম্পাদককে বাইরে ডেকে আনে। আমার সিক্সথ সেন্স কাজ করছিল যে, কিছু একটা হতে পারে, তাই আমি অধ্যক্ষের অফিস সহায়ক নাসিমাকে ভেতরে থাকতে বলি। যেই আমাকে টান দিয়ে বাইরে এনেছে, সঙ্গে সঙ্গে সকাল সাড়ে ১০টার দিকে আপার দরজাটা বন্ধ করে তালা দিয়ে তারা স্লোগান শুরু করে দেয়।’
জরিমানা ও আসন বাতিলের বিষয়ে উপাধ্যক্ষ বলেন, কলেজ ক্যাম্পাসে বর্তমানে নির্মাণকাজ চলায় অনেক বহিরাগত শ্রমিক কাজ করছেন। শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে রাত ১২টার মধ্যে অনুষ্ঠান শেষ করতে বলা হয়েছিল। ভবিষ্যতে শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য কেবল ভয় দেখাতেই প্রাথমিকভাবে দুই ছাত্রীর আসন বাতিলের কথা বলা হয়েছিল। তবে পূজার ছুটির পর গত রবিবার সিদ্ধান্ত হয়, ফাইনাল ইয়ারের ওই দুই শিক্ষার্থীর আসন বাতিল করা হবে না।
তিনি আরও বলেন, ভোর ৫টা পর্যন্ত অডিটোরিয়ামে এসি ও ফ্যান চলায় ১২ হাজার ৬০০ টাকার বিদ্যুৎ বিল এসেছে। এ টাকা হোস্টেলের সব শিক্ষার্থীর কাছ থেকে মাথাপিছু ৫০ থেকে ১০০ টাকা করে সংগ্রহ করে পরিশোধ করতে বলা হয়েছিল।
উপাধ্যক্ষ জানান, বিভাগীয় প্রধান ও শিক্ষকেরা কয়েক দফায় শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনায় বসার প্রস্তাব দিলেও তাঁরা অধ্যক্ষের পদত্যাগের এক দফা দাবিতে অনড় রয়েছেন। বিকেল ৫টার পর অধ্যক্ষকে আর ক্যাম্পাসে দেখতে চান না বলেও শিক্ষার্থীরা আলটিমেটাম দিয়েছেন।
তবে বিসিএস ক্যাডার সার্ভিসের নিয়োগ রাষ্ট্রপতির আদেশে হওয়ায় এভাবে সাদা কাগজে পদত্যাগ নেওয়া সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেন উপাধ্যক্ষ। তিনি জানান, বিষয়টি ইতিমধ্যে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতরের (মাউশি) মহাপরিচালক ও শিক্ষা সচিবকে জানানো হয়েছে। পরিস্থিতি শান্ত রাখতে কলেজ প্রশাসন সর্বোচ্চ সহনশীল ভূমিকা পালন করছে।
এ ব্যাপারে অবরুদ্ধ অধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. মেহেরুন্নেসা সন্ধ্যা ৭টা ৫২ মিনিটে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের দাবির মুখে আমি পদত্যাগ করবো না। সকাল সাড়ে ১০টা থেকে তারা আমাকে আটকে রেখেছে। তাদের দাবি, আমাকে অধ্যক্ষের পদ থেকে পদত্যাগ করতে হবে। কিন্তু কেন তারা এ দাবি করছে, সেটি তারা স্পষ্ট করে জানা যায়নি।’
তিনি বলেন, ‘কলেজের একটি বার্ষিক অনুষ্ঠান এবার রাত ১২টা পর্যন্ত আয়োজনের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু শিক্ষার্থীরা ভোর ৫টা পর্যন্ত অনুষ্ঠান চালিয়েছে। এ ঘটনায় দুজন শিক্ষার্থীর আবাসিক হলের আসন বাতিলের নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। পরে ওই শিক্ষার্থীরা তার কাছে ক্ষমা চাইতে এলে পরীক্ষার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে তিনি আসন বাতিলের সিদ্ধান্ত কার্যকর করেননি।’
অধ্যাপক মেহেরুন্নেসা বলেন, ‘আমি তাদের বলেছি, অনুষ্ঠান করতে হলে নিয়মকানুন মানতে হবে। রাত ১২টা পর্যন্ত অনুমতি দেওয়ার পরও ভোর ৫টা পর্যন্ত অনুষ্ঠান করায় প্রতিষ্ঠানের বিদ্যুৎ বিল বেড়েছে এবং সরকারি অর্থের অপচয় হয়েছে। তাই তাদের ওই অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করতে বলেছি। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের একটি বার্তা দিতে চেয়েছি—তারা চাইলেই নিয়মের বাইরে গিয়ে সবকিছু করতে পারে না।’
তিনি আরও বলেন, ‘এ বিষয়ে তিনি এককভাবে সিদ্ধান্ত নেননি। সংশ্লিষ্ট বিভাগীয় প্রধানদের সঙ্গে আলোচনা করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। হোস্টেল সুপারকেও শিক্ষার্থীদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করতে বলা হয়েছিল। তবে শিক্ষার্থীরা যে এভাবে আন্দোলনে নামবে, তা তারা বুঝতে পারেননি।’
অধ্যক্ষের ভাষ্য, ‘আন্দোলনকারীরা ভাইস প্রিন্সিপাল ও শিক্ষক পরিষদের সম্পাদককে তার কক্ষ থেকে বের করে দিয়ে তাকে আটকে রাখেন। তবে শিক্ষক-কর্মচারীরা তার পাশে রয়েছেন।’ তিনি বলেন, ‘আমি সবাইকে নিয়ে কাজ করি। এককভাবে কোনও সিদ্ধান্ত নিই না। আমার শিক্ষক-কর্মচারী সবাই আমার পাশে আছেন।































